আমাদের ছোটবেলার প্যারেন্টিং

সাধারণত প্যারেন্টিং লিখে ইন্টারনেটে সার্চ করলে আমাদের উপযোগী তেমন ভালো কিছু পাওয়া যায় না, কারণ এটি আমাদের কালচারে নতুন শব্দ। আমাদের সংষ্কৃতির ভিন্নতার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর প্যারেন্টিং আমাদের দেশগুলোতে তেমন কাজে আসে না।

আমাদের এই উপমহাদেশের সংষ্কৃতি মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে। দীর্ঘ একটি সময় নিয়ে এটি মানুষের রক্তে মিশে গেছে। আর পশ্চিমা সংষ্কৃতি ‘জীবনে সফল হওয়া’-‘Being successful in life’ এই দর্শনের ওপর গঠিত হয়েছে। আবেগের ছোঁয়া সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেকটা কম আমাদের এই উপমহাদেশের মানুষের তুলনায়। তাই যে কোন বিষয়ে তাদের চিন্তাভাবনা, পরিবেশ, সংষ্কৃতি, সম্পদ, সুবিধা কোনটাই আমাদের সাথে তেমন মিলে না।

 ‘প্যারেন্টিং’ বলতে পশ্চিমা দেশে যা বুঝা যায় সেটাকে আমাদের সংষ্কৃতিতে মিলাতে চাইলে আমরা হিমসিম খেয়ে যাবো। যেখানে প্রতিটি মানুষ ই আলাদা সেখানে আবার সংষ্কৃতিরও একটা বিশাল পার্থক্য। আসলে আমাদের এখানে প্যারেন্টিং গত দশক পর্যন্ত একটা প্রায় অপ্রয়োজনীয় বিষয় ছিলো তা আগেই বলা হয়েছে।

আমাদের বাবা-দাদাদের কাছে প্যারেন্টিং এর চূড়ান্ত অর্থ ছিলো.. ‘ধুমায়ে পিটা লাগাও, সব ঠিক’। এবং সেটা তখনকার জন্য অনেকটা প্রযোজ্যও ছিলো। যদিও ‘মাইর দেয়া’ ছিলো সর্বোচ্চ সমাধান। যদিও মার পর্যন্ত যেতে হতো না। আমাদের বাবারা বা তাদের বাবারা (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে) তাদের এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে একটা অদৃশ্য  দেয়াল তুলে দিতেন। কর্তৃত্বের ‘Authority’ দেয়াল। বাবার সামনাসামনি হওয়াও একটা ভয়ের ব্যাপার ছিলো। আসলে যতই ভাবি, মনে হয় সংক্ষিপ্ত একটা ট্রেইনিং অবশ্যই প্রয়োজন যে কোন সময়ের জন্যই।

আদর ভালোবাসা অবশ্যই ছিলো তাদের মধ্যে কিন্তু বিশেষ করে বাবারা সেটা অত্যন্ত যত্নে লুকিয়ে রাখতেন। সেটা শুধুমাত্র বোঝা যেত ছেলে-মেয়েরা অসুখে বা কোন বিপদে পড়লে। বাবারা সহজে মারতেন না আবার সহজে আদরও করতেন না। পক্ষান্তরে মায়ের ব্যাপারটা একে বারেই অন্যরকম ছিলো। অতি অল্পে রেগে যান, কারণে অকারণে ‘ঠাস-ঠাস লাগিয়ে’দেন, আবার সহজে আদরও করেন। সব মিলিয়ে পুরোপুরি আবেগীয়, লজিক বিবর্জিত অদ্ভুত এক প্যারেন্টিং স্টাইল চলেই আসছিলো।

এখন যদি বিচার করতে যাই – কিছু ভুল তো অবশ্যই ছিলো, ভালভাবেই ছিলো কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিবেশ, খেলাধূলার অবারিত ব্যবস্থা  ও সুযোগ, প্রচুর বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোন, কোনমতে চালিয়ে দেয়া অযত্নের ‘Careless’ লেখাপড়া সব মিলিয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশেই কেটে গেছে আমাদের বা আমাদের বাবা-মায়েদের শৈশব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *